আটপাড়ায় ‘কুটিরশিল্পের পসরা’: ন্যায্য মজুরি ও স্বীকৃতির দাবি প্রান্তিক নারীদের
প্রান্তিক নারীদের প্রতিদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও উৎপাদনমূলক কাজ সমাজের চোখে অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। সংসারের চাকা সচল রাখা থেকে শুরু করে কৃষি, কুটিরশিল্প ও স্থানীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখলেও তাদের শ্রমের যথাযথ স্বীকৃতি ও ন্যায্য মজুরি মেলে না। নিজেদের অধিকার, শ্রমের মর্যাদা এবং পরিবেশ সুরক্ষায় অবদানের কথা তুলে ধরতে নেত্রকোনার আটপাড়ায় অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘কুটিরশিল্পের পসরা’ শীর্ষক ব্যতিক্রমী কর্মশালা ও প্রদর্শনী।
বৃহস্পতিবার (২৭ আগস্ট) সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত আটপাড়া উপজেলার স্বরমুশিয়া ইউনিয়নের রামজীবনপুর গ্রামে এ কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। স্থানীয় ‘হাবাদা (হাত-বাঁশ-দা) কুটির শিল্প সংগঠন’-এর উদ্যোগে এবং বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘বারসিক’-এর সহযোগিতায় আয়োজিত এ কর্মশালা ও প্রদর্শনীতে এলাকার প্রান্তিক নারী কুটিরশিল্পীরা অংশ নেন।
আয়োজনের শুরুতে কুটিরশিল্প, নারীর শ্রম, জীবিকা ও স্থানীয় অর্থনীতিতে এর গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা হয়। পরে স্থানীয় নারীদের নিজেদের হাতে তৈরি বাঁশ, বেতসহ বিভিন্ন দেশীয় কাঁচামালের পণ্য নিয়ে ছোট পরিসরে মনোরম পসরা সাজানো হয়। প্রদর্শনীতে নারীরা তাদের তৈরি পণ্যের পাশাপাশি পণ্য তৈরির পেছনের গল্প, কাঁচামাল সংগ্রহের নানা প্রতিবন্ধকতা এবং কুটিরশিল্পের সঙ্গে তাদের জীবিকার সম্পর্কের বাস্তব অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।
কর্মশালার মুক্ত আলোচনায় বক্তারা বলেন, নারীদের বহু কষ্টসাধ্য ও উৎপাদনমূলক কাজকে এখনো সমাজের একটি অংশ ‘ঘরের কাজ’ বা ‘গৃহস্থালি কাজ’ হিসেবে দেখে। অথচ একজন নারী সংসারের রান্নাবান্না, ঘর গোছানো ও সন্তান লালন-পালনের পাশাপাশি বীজ সংরক্ষণ, কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, হাঁস-মুরগি পালন, সেলাই ও হস্তশিল্পের মতো নানা উৎপাদনমূলক কাজে যুক্ত থাকেন। এসব কাজ পরিবারকে সহযোগিতা করার পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিকে শক্তিশালী করলেও তার আর্থিক মূল্যায়ন খুব কমই হয়।
কর্মশালায় অংশ নেওয়া নারী শিল্পী দিলোরা বলেন, “আমরা শুধু সংসার করি না, সারাদিন কাজ করি। ঘরের কাজের পাশাপাশি নিজের হাতে জিনিস বানাই। কাজের সময় আমাদের শ্রমের কোনো হিসাব হয় না। সংসারের জন্য করি বলে হয়তো কাজটা কাজ মনে হয় না। আমরা চাই—আমাদের কাজটাকেও ‘কাজ’ হিসেবে দেখা হোক।”
আরেক শিল্পী হাজেরা আক্তার বলেন, “আমরা অনেক কষ্ট করে পণ্য বানাই। কিন্তু বিক্রির সময় ক্রেতারা আমাদের শ্রমের দাম দিতে চান না। একটি পণ্য তৈরি করতে কত সময় লাগে, কত কষ্ট হয়—সেটা কেউ দেখে না। আমরা কারও দয়া চাই না, আমাদের কাজের ন্যায্য দাম চাই।”
নিজেদের পরিচয় ও মর্যাদা প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে হাওয়া আক্তার বলেন, “আমাদের হাতের কাজ দিয়ে সংসার চলে, পরিবারে সহযোগিতা হয়। কিন্তু সম্মানের জায়গায় আমরা অনেক সময় পিছিয়ে থাকি। আমরা চাই, আমাদের কাজের সঙ্গে আমাদের পরিচয়টাও মানুষ দেখুক এবং মূল্যায়ন করুক।”
আলোচনায় কুটিরশিল্পের সঙ্গে কৃষি ও পরিবেশের নিবিড় সম্পর্কের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। বক্তারা বলেন, পাট, বাঁশ, ধানের খড়সহ বিভিন্ন কৃষিজ ও স্থানীয় উপকরণ কুটিরশিল্পের কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এসব উপকরণ পরিবেশবান্ধব হওয়ায় কুটিরশিল্প একদিকে যেমন স্থানীয় অর্থনীতিকে সচল রাখে, অন্যদিকে প্লাস্টিকের ব্যবহার কমিয়ে পরিবেশ সুরক্ষায়ও ভূমিকা রাখে।
পরিবেশ রক্ষায় নিজেদের অবদানের কথা তুলে ধরে অংশগ্রহণকারী নারীরা প্রশ্ন রাখেন, “পরিবেশটাকে আমরা ভালো রাখি, হাতে কাজ করি; কিন্তু আমাদের শ্রমের মূল্যটা কোথায়?”
কর্মশালার শেষপর্বে নারী কুটিরশিল্পীরা তাদের বিভিন্ন সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে পণ্যের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, স্থানীয় বাজারের সীমাবদ্ধতা, কাঁচামালের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি, শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নের অভাব এবং নারীর কাজকে ছোট করে দেখার সামাজিক প্রবণতা।
অনুষ্ঠানের সমাপনী আলোচনায় কৃষাণী বাসনা আক্তারের দৃঢ় বক্তব্য উপস্থিতদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তিনি বলেন, “আমরা কারও দয়া চাই না। আমরা কাজ করি, নিজের হাতে তৈরি করি। আমরা শুধু চাই—আমাদের শ্রমকে সম্মান করা হোক।”
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, ‘কুটিরশিল্পের পসরা’ শুধু পণ্য প্রদর্শনের একটি আয়োজন নয়; এটি প্রান্তিক নারীদের শ্রমের স্বীকৃতি, ন্যায্য মজুরি, আত্মমর্যাদা ও অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিকে সামনে আনার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ। পাশাপাশি দেশীয় কাঁচামালনির্ভর কুটিরশিল্পকে উৎসাহিত করার মাধ্যমে স্থানীয় অর্থনীতি ও পরিবেশ সুরক্ষায়ও এ ধরনের উদ্যোগ ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে।
Tags:
আটপাড়ায়
কুটিরশিল্পের
পসরা:
ন্যায্য
মজুরি
স্বীকৃতির
দাবি
প্রান্তিক
প্রান্তিক নারীদের প্রতিদিনের হাড়ভাঙা পরিশ্রম ও উৎপাদনমূলক কাজ সমাজের চোখে অনেকটাই অদৃশ্য থেকে যায়। সংসারের চাকা সচল রাখা থেকে শুরু করে কৃষ...
আগস্ট ২৭, ২০২৬
‘‘মোরা একই বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু মুসলমান’’ এই প্রতিপাদ্যে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ৫০তম প্রয়াণ দিবস পালিত হয়েছে। বৃহস্পতিবার (২৭ আগষ্...
আগস্ট ২৭, ২০২৬

