হারিকেন: সেকালের আলো, একালের স্মৃতির পাতায় হারিয়ে যাওয়া এক ঐতিহাসিক বস্তু
**মো: আল-মাহফুজ শাওন **
একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হারিকেনের মৃদু আলো। বিদ্যুৎবিহীন সেই সময়ে মানুষের রাতের অন্ধকার দূর করার অন্যতম প্রধান ভরসা ছিল এই ঐতিহ্যবাহী আলোকযন্ত্র। কেরোসিন তেল, সলতে ও আগুনের সাহায্যে জ্বালানো হারিকেন ছিল একসময় গ্রাম থেকে শহর—সবখানেই নিত্যদিনের প্রয়োজনীয় একটি বস্তু। অথচ আধুনিকতার দ্রুত অগ্রযাত্রায় সেই হারিকেন আজ প্রায় বিলুপ্তির পথে।
হারিকেন মূলত ধাতব দেহের তৈরি একটি বাতি। এর ভেতরে থাকে কেরোসিন তেলের পাত্র ও কাপড়ের সলতে। সলতেতে কেরোসিন উঠে এলে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। আগুনের চারপাশে থাকে কাঁচের চিমনি, যা বাতাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণ করে এবং শিখাকে সুরক্ষিত রাখে। হারিকেনের চারপাশের ধাতব কাঠামো একে বহনযোগ্য করে তুলেছিল। ফলে ঘরের ভেতর, উঠান, গোয়ালঘর, দোকান কিংবা রাতের পথচলায় সহজেই এটি ব্যবহার করা যেত।
### সেকালের জীবনে হারিকেন
একসময় সন্ধ্যার পর গ্রামের মেঠোপথে হাতে হারিকেন নিয়ে হাঁটা ছিল খুবই স্বাভাবিক দৃশ্য। কৃষক মাঠ থেকে বাড়ি ফিরতেন হারিকেনের আলো সঙ্গে নিয়ে। বাড়ির উঠানে বসে গল্প, পড়াশোনা কিংবা রাতের খাবারের আয়োজন—সবকিছুর সঙ্গেই জড়িয়ে ছিল এর ব্যবহার।
শিক্ষার্থীদের কাছেও হারিকেন ছিল একান্ত সঙ্গী। বিদ্যুৎ না থাকায় পরীক্ষার প্রস্তুতি থেকে শুরু করে স্কুলের পড়া—অনেকেই হারিকেনের আলোতেই শেষ করতেন। মায়েরা সেই আলোয় রান্না করতেন, পরিবারের প্রবীণরা বসে গল্প করতেন, আর শিশুরা হারিকেনের আলো ঘিরে শুনত নানা গল্প।
শুধু ঘরেই নয়, দোকানপাট, চায়ের দোকান, নৌযান, গ্রামীণ হাট-বাজার এমনকি বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানেও হারিকেনের ব্যবহার ছিল ব্যাপক। রাতের অন্ধকারে এটি ছিল যেন ছোট্ট এক সূর্য।
### শহরেও ছিল হারিকেনের কদর
হারিকেন শুধু গ্রামবাংলার স্মৃতি নয়, শহরের জীবনেও একসময় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। বিদ্যুৎ চলে গেলে কিংবা দুর্গম এলাকায় বিদ্যুতের সংযোগ না থাকলে হারিকেনই ছিল মানুষের অন্যতম নির্ভরযোগ্য আলো।
বিশেষ করে বর্ষাকালে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় ঘরের এক কোণে রাখা হারিকেন বের করে জ্বালানোর দৃশ্য ছিল খুবই পরিচিত। অনেক পরিবারের কাছে হারিকেন ছিল জরুরি সময়ের ‘ব্যাকআপ আলো’।
### একালের আধুনিকতায় হারিয়ে যাচ্ছে
সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে মানুষের জীবনযাত্রায় এসেছে বৈপ্লবিক পরিবর্তন। বিদ্যুতের বিস্তার, টর্চলাইট, চার্জার লাইট, এলইডি বাতি, সৌরবিদ্যুৎ ও মোবাইল ফোনের ফ্ল্যাশলাইট হারিকেনের জায়গা দখল করেছে।
একসময় যে হারিকেন ছাড়া রাত কল্পনা করা কঠিন ছিল, এখন সেটি অনেক বাড়িতেই আর দেখা যায় না। নতুন প্রজন্মের অনেকেই হারিকেন দেখেছে শুধু পুরোনো ছবি, গল্প কিংবা জাদুঘরের সংগ্রহে।
### স্মৃতিতে বেঁচে থাকবে হারিকেন
হারিকেন শুধু একটি আলোকযন্ত্র ছিল না; এটি ছিল একটি সময়ের প্রতিচ্ছবি। এর ক্ষীণ আলোয় জড়িয়ে আছে গ্রামবাংলার অসংখ্য মানুষের শৈশব, পড়াশোনা, পারিবারিক আড্ডা, রাতের গল্প ও জীবনসংগ্রামের স্মৃতি।
প্রযুক্তির অগ্রগতির কাছে হারিকেন হয়তো তার ব্যবহারিক প্রয়োজনীয়তা হারিয়েছে, কিন্তু ইতিহাস ও স্মৃতিতে এর গুরুত্ব এখনো অমলিন। সেকালের মানুষের জীবনকে যারা কাছ থেকে দেখেছেন, তাদের কাছে হারিকেনের আলো কেবল কেরোসিনের আগুন নয়—এটি একটি হারিয়ে যাওয়া সময়ের আলো।
আজকের প্রজন্ম হয়তো হারিকেন হাতে নিয়ে রাতের পথ চলবে না। কিন্তু ইতিহাসের পাতায়, পুরোনো বাড়ির কোনো সিন্দুকে কিংবা কোনো প্রবীণের স্মৃতিতে থাকা একটি মরিচাধরা হারিকেন তাদের মনে করিয়ে দিতে পারে—**একসময় এই ছোট্ট বাতিটিই ছিল অন্ধকার রাতে মানুষের সবচেয়ে বড় ভরসা।**
**সেকালের হারিকেন তাই আজ কেবল একটি পুরোনো বস্তু নয়; এটি আমাদের গ্রামবাংলার জীবন, সংস্কৃতি ও হারিয়ে যাওয়া সময়ের এক নীরব সাক্ষী।**
Tags:
হারিকেন
সেকালের আলো
ঐতিহ্যবাহী আলোকযন্ত্র
কেরোসিন তেল
গ্রামবাংলার জীবন
বিদ্যুৎবিহীন যুগ
পুরোনো বস্তু
হারিয়ে যাওয়া সময়
**মো: আল-মাহফুজ শাওন ** একসময় সন্ধ্যা নামলেই গ্রামবাংলার ঘরে ঘরে জ্বলে উঠত হারিকেনের মৃদু আলো। বিদ্যুৎবিহীন সেই সময়ে মানুষের রাতের অন্ধকার দ...
আগস্ট ২২, ২০২৬
দেশে প্রথমবারের মতো ৭০০ মেগাহার্জ ব্যান্ড চালু করল গ্রামীণফোন ঢাকা ১৫ জুন দেশে প্রথমবারের মতো ৭০০ মেগাহার্জ (MHz) লো-ব্যান্ড স্পেকট্রাম ব্যব...
জুন ১৫, ২০২৬
-
৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী
-
৪৭তম জাতীয় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি সপ্তাহের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন তথ্য ও প্রযুক্তি মন্ত্রী
-
টাঙ্গাইলে স্টার্টআপ, বিজ্ঞান প্রকল্প ও উদ্ভাবনী ধারণা প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত

