থানা হেফাজতে রাজু বিশ্বাসের মৃত্যু: ওসি-এসআইয়ের বিরুদ্ধে নির্যাতনের অভিযোগ, তদন্তের দাবি
মো: আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:
খুলনায় রাজু বিশ্বাস (২৬) নামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, গণপিটুনিতে নয়, বরং আড়ংঘাটা থানা পুলিশের হেফাজতে নেওয়ার পর শারীরিক নির্যাতনের কারণেই রাজুর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে এবং পরে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় আড়ংঘাটা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. হালিমুর রহমান ও এসআই মিলনের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে।
নিহতের পরিবার ও স্থানীয় সচেতন মহল ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইনানুগ শাস্তির দাবি জানিয়েছে। তবে পুলিশের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানা গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
ঘটনার সূত্রপাত গত মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) বেলা ১১টার দিকে। নিহত রাজু বিশ্বাস খানজাহান আলী থানার পাড়িয়ারডাঙ্গা এলাকার বাড়ি থেকে বন্ধুদের ফোন পেয়ে বের হন। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য, বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় রাজু তাঁর মায়ের হাতে ১০০ টাকার একটি নোট দিয়ে দ্রুত ফিরে আসার কথা জানিয়েছিলেন। এরপর বন্ধুদের সঙ্গে তিনি রায়েরমহল এলাকায় যান।
স্থানীয় সূত্রের বরাতে জানা যায়, সেখানে তিন বছর বয়সী মিম নামের একটি শিশুকে উদ্ধারের ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজুকে ‘ছেলেধরা’ সন্দেহে আটক করা হয়। তবে বিষয়টি নিয়ে নানা ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয়দের একটি অংশের দাবি, পারিবারিক বিরোধের জেরে সৃষ্ট পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে রাজুকে ছেলেধরা হিসেবে সন্দেহ করা হয়।
এ সময় শিশুটির দাদি ফাতেমার চিৎকারে স্থানীয় কয়েকজন রাজুকে আটক করে ফাতেমার ভাড়া করা একটি গ্যারেজে নিয়ে যান বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে তাঁকে মারধর করা হয় বলেও স্থানীয়দের দাবি।
পরে খবর পেয়ে আড়ংঘাটা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে রাজুকে উদ্ধার করে। স্থানীয়দের ধারণ করা একটি ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, পুলিশ তাঁকে উদ্ধারের পর রাজু নিজে হেঁটে গাড়িতে উঠছেন। পরিবার ও স্থানীয়দের দাবি, ওই সময় তাঁর অবস্থা এমন ছিল না যে তাঁকে জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন হতে পারে—যদিও এ বিষয়ে চিকিৎসাবিদ বা পুলিশের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য এখনো পাওয়া যায়নি।
এরপরই ঘটনার সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগটি সামনে আসে। নিহতের পরিবারের দাবি, রাজুকে উদ্ধারের পর দ্রুত হাসপাতালে না নিয়ে থানায় নেওয়া হয়। পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, থানায় নেওয়ার পর তাঁর ওপর আবারও শারীরিক নির্যাতন করা হয়।
পরিবার ও স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, আড়ংঘাটা থানায় রাজুকে নিয়ে যাওয়ার পর ওসি মো. হালিমুর রহমান ও এসআই মিলনের বিরুদ্ধে মারধরের অভিযোগ রয়েছে। এমনকি নির্যাতনের সময় এসআই মিলন রাজুর গলা চেপে ধরেন এবং ওসি হালিমুর রহমান তাঁর ওপর শারীরিকভাবে আঘাত করেন—এমন অভিযোগও করেছেন নিহতের স্বজনরা।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনার প্রকৃত কারণ জানতে প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য, ভিডিও ফুটেজ, থানার সিসিটিভি ফুটেজ, পুলিশি নথি এবং চিকিৎসা সংক্রান্ত প্রতিবেদন পর্যালোচনা করা জরুরি বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
অভিযোগ রয়েছে, থানা হেফাজতে থাকার সময় রাজুর শারীরিক অবস্থার অবনতি হলে তাঁকে দ্রুত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মঙ্গলবার সন্ধ্যায় চিকিৎসকরা তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন।
রাজুর মৃত্যুর ঘটনায় এলাকায় ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, রাজু কোনো অপরাধে জড়িত থাকলে তাঁকে আইন অনুযায়ী গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে বিচারিক প্রক্রিয়ায় নেওয়ার সুযোগ ছিল। কিন্তু গণপিটুনির পর পুলিশ হেফাজতে নেওয়া একজন ব্যক্তির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা পুলিশের দায়িত্ব। হেফাজতে থাকা অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হলে কীভাবে এবং কোন পরিস্থিতিতে তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটল, সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
নিহতের স্বজনরা ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে আড়ংঘাটা থানার ওসি মো. হালিমুর রহমান, এসআই মিলনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর আইনগত ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে।
এদিকে, রাজুর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করতে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে থানা হেফাজতে তাঁর অবস্থানকালীন সিসিটিভি ফুটেজ সংরক্ষণ, প্রত্যক্ষদর্শীদের সাক্ষ্য গ্রহণ এবং উদ্ধার থেকে হাসপাতালে নেওয়া পর্যন্ত পুরো সময়ের ঘটনাক্রম তদন্তের আওতায় আনার দাবি উঠেছে।
রাজুর মৃত্যুর ঘটনায় একদিকে যেমন ‘ছেলেধরা’ গুজবকে কেন্দ্র করে গণপিটুনির অভিযোগের বিষয়টি তদন্তের দাবি রাখে, অন্যদিকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর তাঁর সঙ্গে কী ঘটেছিল—সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের আইনের আওতায় আনা এবং অভিযোগ অসত্য হলে প্রকৃত ঘটনা জনসমক্ষে তুলে ধরার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।
নোট: ওসি ও এসআইয়ের বিরুদ্ধে উত্থাপিত অভিযোগগুলো তদন্তাধীন/অভিযোগ হিসেবে উপস্থাপন করা হলো; স্বাধীনভাবে সত্যতা নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত এগুলোকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়।
মো: আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:খুলনায় রাজু বিশ্বাস (২৬) নামে এক যুবকের মৃত্যুকে কেন্দ্র করে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। নিহতের পরিবার ও স্থানীয় ক...
মো. আল-মাহফুজ শাওন, খুলনা:খুলনা জেনারেল হাসপাতালে আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. এস এম মুরাদ হোসেনের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও দুর্নীতির একাধিক অ...

