দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, অথচ সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ছে—নবম পে-স্কেলের বোঝা বইবে কে?
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই চাপ থেকে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ কোথায়?
দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না। জ্বালানি খাতেও কাঙ্ক্ষিত স্থিতিশীলতা আসেনি। কৃষককে সার পেতে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হচ্ছে—কোথাও ভোটার আইডি কার্ড দেখিয়ে সার সংগ্রহের জন্য দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ানোর অভিযোগও রয়েছে। বাজারে সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য বন্ধ করা যায়নি। সবজিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় অনেক পণ্যের দাম এখন সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিদ্যুৎ, গ্যাস ও জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে মানুষের ভোগান্তি। ডলার সংকট, বৈদেশিক ঋণের চাপ এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তার মধ্যেই সরকারি কর্মচারীদের জন্য বড় ধরনের বেতন বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
প্রস্তাবিত নবম পে-স্কেলে সর্বোচ্চ বেতন ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা এবং সর্বনিম্ন ২০ হাজার টাকা করার কথা বলা হয়েছে। সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন-ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ানোর এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য যদি হয় জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে তাদের আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, তাহলে সেটি অবশ্যই আলোচনার বিষয়। কিন্তু একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠছে—এই বাড়তি ব্যয়ের অর্থের উৎস কী?
কারণ দেশের অর্থনীতিতে সরকারি চাকরিজীবী একটি নির্দিষ্ট জনগোষ্ঠী। তাদের বাইরে রয়েছেন কোটি কোটি মানুষ—দিনমজুর, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, বেসরকারি চাকরিজীবী এবং নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবার। তাদের বড় একটি অংশের আয় গত কয়েক বছরে জীবনযাত্রার ব্যয়ের তুলনায় সেভাবে বাড়েনি। অথচ নিত্যপণ্যের দাম বেড়েছে বহুগুণ।
একজন অষ্টম শ্রেণি পাস করে সরকারি ২০তম গ্রেডের চাকরিতে যোগ দিয়ে যদি ২০ হাজার টাকা বেতন পান, অন্যদিকে একজন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ১৫ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেন—তাহলে প্রশ্ন উঠবেই, দেশের শ্রমবাজার ও আয় কাঠামোর মধ্যে এই বৈষম্য কতটা যৌক্তিক?
আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পর সেই অতিরিক্ত অর্থের জোগান আসবে কোথা থেকে?
সরকারের রাজস্ব আয় বাড়াতে হলে শেষ পর্যন্ত কর, ভ্যাট ও অন্যান্য রাজস্বের ওপর নির্ভর করতে হবে। কিন্তু রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর নামে যদি সাধারণ মানুষের ওপর করের চাপ বাড়ে এবং একই সময়ে বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম আরও বেড়ে যায়, তাহলে বেতন বৃদ্ধির সুফল কি কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না?
অর্থনীতির একটি সাধারণ বাস্তবতা হলো—বড় ধরনের অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের অর্থের জোগান নিশ্চিত করতে হয়। রাজস্ব আয় পর্যাপ্ত না হলে সরকারকে দেশি-বিদেশি ঋণের ওপরও নির্ভর করতে হতে পারে। সেই ঋণের সুদ ও মূলধন পরিশোধের দায় শেষ পর্যন্ত জনগণের ওপরই পড়ে।
মানুষ ভ্যাট দেয়, ট্যাক্স দেয়, পণ্য কেনার সময় বাড়তি দাম দেয়। ফলে প্রশ্ন থেকেই যায়—সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি বড় অংশ যদি বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যয় হয়, তাহলে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, অবকাঠামোসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যয়ের সক্ষমতা কতটা থাকবে?
এখানে আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। সরকারি খাতে বেতন বাড়লেও বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় যদি একই হারে না বাড়ে, তাহলে আয়বৈষম্য আরও বাড়তে পারে। সরকারি চাকরিজীবীদের জীবনযাত্রার মান উন্নত হবে, কিন্তু একই সময়ে বেসরকারি চাকরিজীবী, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও নিম্ন আয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা যদি কমতে থাকে, তাহলে অর্থনৈতিক বৈষম্য আরও প্রকট হবে।
শুধু বেতন বাড়িয়ে অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে, সিন্ডিকেট ও কৃত্রিম মূল্যবৃদ্ধি নিয়ন্ত্রণ করতে হবে, কৃষি উৎপাদন বাড়াতে হবে, জ্বালানি খাতকে স্থিতিশীল করতে হবে এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে হবে।
বিশেষ করে তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি। ‘এক কোটি কর্মসংস্থান’ সৃষ্টির মতো বড় লক্ষ্য ঘোষণা করা সহজ, কিন্তু সেটি বাস্তবে কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—তার স্বচ্ছ হিসাবও জনগণের সামনে থাকা প্রয়োজন।
দেশের অর্থনীতি যখন চাপের মধ্যে, তখন একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির আয় বাড়ানোর পাশাপাশি কোটি কোটি সাধারণ মানুষের আয় ও ক্রয়ক্ষমতা কীভাবে বাড়ানো হবে—সেটিই হওয়া উচিত নীতিনির্ধারণের অন্যতম প্রধান প্রশ্ন।
কারণ সরকারি চাকরিজীবী কয়েক লাখ হতে পারেন, কিন্তু দেশের সাধারণ মানুষ কোটি কোটি।
একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির বেতন বাড়ানো হলে তার সুফল তারা সরাসরি পান। কিন্তু এর অর্থের জোগান দিতে গিয়ে যদি মূল্যস্ফীতি বাড়ে, কর-ভ্যাটের চাপ বাড়ে কিংবা ঋণের বোঝা বাড়ে, তাহলে সেই ব্যয়ের প্রভাব পড়ে পুরো জনগোষ্ঠীর ওপর।
তাই প্রশ্নটা বেতন বাড়ানো উচিত কি না—শুধু সেটি নয়। প্রশ্ন হলো, বেতন বাড়ানোর পাশাপাশি সাধারণ মানুষের আয়, কর্মসংস্থান ও ক্রয়ক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনা কোথায়?
বাজার নিয়ন্ত্রণ করা যাচ্ছে না, উৎপাদন কাঙ্ক্ষিত হারে বাড়ছে না, কর্মসংস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে—এ অবস্থায় অর্থনীতির ভারসাম্য রক্ষা করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার।
অর্থনীতি যদি শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়, রাজস্ব আয় বাড়ে, উৎপাদন ও কর্মসংস্থান বৃদ্ধি পায় এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসে—তাহলে বেতন বৃদ্ধি নিয়ে আপত্তির জায়গাও কমে আসে।
কিন্তু অর্থনীতির ভিত্তি দুর্বল থাকা অবস্থায় হঠাৎ বড় পরিমাণ বেতন বৃদ্ধি করা হলে এর দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।
শেষ পর্যন্ত জনগণের প্রশ্ন একটাই—এই বাড়তি ব্যয়ের বোঝা বইবে কে?
উত্তর যদি আবারও হয়—সাধারণ মানুষ, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই: তাদের আয় বাড়বে কবে?
Tags:
দ্রব্যমূল্য
নিয়ন্ত্রণে
ব্যর্থতা
অথচ
সরকারি
চাকরিজীবীদের
বেতন
দেশের সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—এই চাপ থেকে মানুষকে স্বস্তি দেওয়ার কার্যকর উদ্যোগ কোথায়? দ্রব্য...
সেপ্টেম্বর ১, ২০২৬
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলায় ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরের কৃষি প্রণোদনা কর্মসূচির আওতায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকদের মাঝে বিনামূল্যে উচ্চ ফলনশীল (উ...
জুলাই ৩, ২০২৬

