শিক্ষাঙ্গন

টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যের ধারক সরকারি সা’দত কলেজ ইতিহাস বিকাশ ও অবদান

মো: সাজিদ পিয়াল
মো: সাজিদ পিয়াল সিনিয়র রিপোর্টার ( মুক্তধ্বনি )
মে ২০, ২০২৬
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যের ধারক সরকারি সা’দত কলেজ ইতিহাস বিকাশ ও অবদান
টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যের ধারক সরকারি সা’দত কলেজ ইতিহাস বিকাশ ও অবদান টাঙ্গাইলের করটিয়ায় অবস্থিত সরকারি সা’দত কলেজ শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, বরং বাংলাদেশের শিক্ষা-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ। প্রায় এক শতাব্দীর ঐতিহ্য বহনকারী এই বিদ্যাপীঠ উত্তরবঙ্গ ও মধ্যাঞ্চলের শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষার অন্যতম নির্ভরতার কেন্দ্র হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে ভূমিকা পালন করে আসছে। এর প্রতিষ্ঠা, বিকাশ, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অবদান—সব মিলিয়ে সা’দত কলেজ বাংলাদেশের ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর মধ্যে বিশেষ মর্যাদা লাভ করেছে।প্রতিষ্ঠার পটভূমি ও জমিদার পন্নী পরিবারের অবদানব্রিটিশ শাসনামলে শিক্ষা বিস্তারের ক্ষেত্রে জমিদার ও অভিজাত পরিবারের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সেই ধারাবাহিকতায় শিক্ষানুরাগী জমিদার ওয়াজেদ আলী খান পন্নী ১৯২৬ সালের জুলাই মাসে তাঁর পিতামহ সা’দত আলী খান পন্নী-এর স্মৃতিকে অমর করে রাখতে করটিয়ায় এই কলেজ প্রতিষ্ঠা করেন। তৎকালীন সময়ে টাঙ্গাইল অঞ্চলে উচ্চশিক্ষার সুযোগ সীমিত ছিল। ঢাকায় গিয়ে পড়াশোনা করা অধিকাংশ সাধারণ পরিবারের পক্ষে সম্ভব ছিল না। ফলে স্থানীয় শিক্ষার্থীদের জন্য একটি মানসম্মত কলেজ প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা থেকেই সা’দত কলেজের জন্ম হয়। কলেজটি ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে প্রায় ২৭ একর জমির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়, যা সে সময়ের জন্য অত্যন্ত পরিকল্পিত ও বৃহৎ উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত ছিল। শুরুতে মাত্র ১০৮ জন শিক্ষার্থী নিয়ে কলেজটির যাত্রা শুরু হলেও খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এটি বৃহত্তর ময়মনসিংহ ও টাঙ্গাইল অঞ্চলের অন্যতম শিক্ষাকেন্দ্রে পরিণত হয়। প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ ইবরাহীম খাঁর নেতৃত্ব কলেজটির বিকাশে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক ও চিন্তাবিদ ইবরাহীম খাঁ। তিনি ১৯২৬ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত কলেজের অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।ইবরাহীম খাঁ ছিলেন একজন আধুনিক ও প্রগতিশীল শিক্ষাচিন্তার ধারক। তাঁর নেতৃত্বে কলেজটিতে শুধু পাঠ্যক্রমভিত্তিক শিক্ষা নয়, সাহিত্য সংস্কৃতি, বিতর্ক ও সামাজিক চেতনার বিকাশেও গুরুত্ব দেওয়া হয়। তিনিশিক্ষার্থীদের নৈতিকতা নেতৃত্ব ও মানবিক মূল্যবোধ গঠনে বিশেষ মনোযোগ দেন।অনেক বিশ্লেষকের মতে সা’দত কলেজের প্রাথমিক শক্ত ভিত নির্মাণে ইবরাহীম খাঁর দূরদর্শী নেতৃত্বই ছিল মূল চালিকাশক্তি। একাডেমিক বিকাশ: সাধারণ কলেজ থেকে পূর্ণাঙ্গ স্নাতকোত্তর প্রতিষ্ঠানসা’দত কলেজ প্রতিষ্ঠার পর ধারাবাহিকভাবে এর একাডেমিক পরিধি বৃদ্ধি পেতে থাকে।ডিগ্রি কলেজে উন্নীতকরণ (১৯৩৮)প্রতিষ্ঠার মাত্র এক যুগের মধ্যেই কলেজটি শিক্ষাগত মান ও শিক্ষার্থী সংখ্যার কারণে ১৯৩৮ সালে ডিগ্রি কলেজে উন্নীত হয়। এটি ছিল কলেজটির জন্য প্রথম বড় একাডেমিক স্বীকৃতি।অনার্স কোর্স চালু (১৯৬৬) পাকিস্তান আমলে উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে ১৯৬৬ সালে কলেজটিতে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স কোর্স চালু হয়। এর ফলে টাঙ্গাইল অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা স্থানীয় পর্যায়েই উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণের সুযোগ পায়। মাস্টার্স কোর্স চালু (১৯৭৪)স্বাধীনতার পর ১৯৭৪ সালে মাস্টার্স কোর্স চালুর মাধ্যমে কলেজটি পূর্ণাঙ্গ স্নাতকোত্তর কলেজে রূপ নেয়। এটি ছিল প্রতিষ্ঠানটির ইতিহাসে আরেকটি বড় মাইলফলক। বর্তমানে কলেজটি জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়-এর অধীনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করছে।ঐতিহাসিক মূল ভবন ও স্থাপত্য ঐতিহ্য কলেজটির মূল ভবন শুধু একটি প্রশাসনিক বা একাডেমিক ভবন নয় এটি ঐতিহাসিক স্থাপত্যেরও অংশ। বাংলার প্রখ্যাত নেতা এ কে ফজলুল হক এই ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেছিলেন।১৯৩৯ সালে নির্মিত ভবনটি ব্রিটিশ আমলের স্থাপত্যশৈলী বহন করে। দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও ভবনটি এখনো কলেজের ঐতিহ্য ও ইতিহাসের প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ভবনটির নির্মাণশৈলীতে উপমহাদেশীয় ঔপনিবেশিক স্থাপত্যের প্রভাব লক্ষ্য করা যায়।সরকারিকরণ ও প্রশাসনিক পরিবর্তন১৯৭৯ সালের ৭ জুলাই কলেজটিকে সরকারিকরণ করা হয়। সরকারিকরণের ফলে কলেজটির প্রশাসনিক কাঠামোশিক্ষক নিয়োগ অবকাঠামো উন্নয়ন ও একাডেমিক সুযোগ-সুবিধা আরও সম্প্রসারিত হয়।সরকারি কলেজে রূপান্তরের পর শিক্ষার্থী সংখ্যা দ্রুত বৃদ্ধি পায় এবং কলেজটি জাতীয় পর্যায়ে আরও পরিচিতি লাভ করে।রাজনৈতিক সাংস্কৃতিক ও সামাজিক ভূমিকা সা’দত কলেজ শুধু শিক্ষাক্ষেত্রেই নয় বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।ভাষা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধ ভাষা আন্দোলন স্বাধিকার আন্দোলন ও মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় কলেজটির শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতা আন্দোলনের বিভিন্ন কর্মসূচিতে এ কলেজের ছাত্রসমাজ অংশগ্রহণ করেছিল বলে স্থানীয় ইতিহাসে উল্লেখ পাওয়া যায়।সাংস্কৃতিক চর্চা কলেজটি দীর্ঘদিন ধরে টাঙ্গাইল অঞ্চলের সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র হিসেবে পরিচিত। সাহিত্যচর্চ নাটক বিতর্ক, সংগীত ও ছাত্ররাজনীতির মাধ্যমে এ প্রতিষ্ঠান বহু নেতৃত্ব তৈরি করেছে।বর্তমান অবস্থান ও গুরুত্ব বর্তমানে সরকারি সা’দত কলেজ টাঙ্গাইল অঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ সরকারি কলেজ। এখানে বিভিন্ন বিষয়ে অনার্স ও মাস্টার্স কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। হাজারো শিক্ষার্থী প্রতি বছর এ প্রতিষ্ঠান থেকে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করছে।প্রতিষ্ঠানটির দীর্ঘ ইতিহাস একাডেমিক সুনাম, ঐতিহ্যবাহী পরিবেশ ও সামাজিক অবদান একে দেশের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী কলেজগুলোর কাতারে স্থান দিয়েছে।এক শতাব্দীর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে সরকারি সা’দত কলেজ আজও শিক্ষা বিস্তার, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও জাতীয় অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
Tags: টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যের ধারক সরকারি সা’দত কলেজ ইতিহাস বিকাশ

শিক্ষাঙ্গন

নূরানী স্কলারশিপ-২০২৬ নিয়ে টাঙ্গাইল জেলা নূরানী শিক্ষক ফাউন্ডেশ নের জরুরি সভা নূরানী স্কলারশিপ-২০২৬ নিয়ে টাঙ্গাইল জেলা নূরানী শিক্ষক ফাউন্ডেশ নের জরুরি সভা

নূরানী স্কলারশিপ-২০২৬ সফলভাবে বাস্তবায়নের লক্ষ্যে টাঙ্গাইল জেলা নূরানী শিক্ষক ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আলোচনা ও জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। রোববার...

আগস্ট ১৬, ২০২৬
মধুপুরে শিশুমেলা অনুষ্ঠিত ১৭ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা মধুপুরে শিশুমেলা অনুষ্ঠিত ১৭ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা

মধুপুরে শিশুমেলা অনুষ্ঠিত ১৭ বৃত্তিপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা টাঙ্গাইলের মধুপুর উপজেলার শোলাকুড়ী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের উদ্যোগে বৃহ...

জুলাই ২৩, ২০২৬

0 মন্তব্য