দেশনেত্রী খালেদা জিয়ার মহাপ্রয়াণ: আপসহীন এক রাজনৈতিক মহাকাব্যের অবসান
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দীর্ঘ চার দশকের এক বর্ণাঢ্য ও কণ্টকাকীর্ণ অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটল। ব্যক্তিগত শোক, রাজনৈতিক নিপীড়ন আর দীর্ঘ অসুস্থতার সাথে লড়াই করে চিরবিদায় নিলেন বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া। তাঁর প্রয়াণে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে গভীর শোকের ছায়া নেমে এসেছে।
১৯৪৬ সালে দিনাজপুরে জন্ম নেওয়া খালেদা খানম 'পুতুল' ১৯৬০ সালে তৎকালীন ক্যাপ্টেন জিয়াউর রহমানের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। ১৯৮১ সালে রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের পর এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে দুই সন্তান নিয়ে পথে বসেন তিনি। তবে নেতাকর্মীদের চাপে ১৯৮২ সালে রাজনীতিতে তাঁর অভিষেক ঘটে। ১৯৮৪ সালে তিনি বিএনপির চেয়ারপারসন নির্বাচিত হন।
স্বৈরাচার এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে তাঁর ভূমিকা ছিল কিংবদন্তিতুল্য। ১৯৮৩ থেকে ১৯৯০ পর্যন্ত সাত বছরের আন্দোলনে তিনি সাতবার বন্দি হন, কিন্তু আদর্শে অটল থেকে অর্জন করেন ‘আপসহীন’ নেত্রীর খেতাব।
১৯৯১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন খালেদা জিয়া। তাঁর শাসনামলেই দেশে সংসদীয় শাসন ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তিত হয়। প্রাথমিক শিক্ষা বাধ্যতামূলক করা, নারী শিক্ষার প্রসার এবং গার্মেন্ট শিল্পের বিকাশে তাঁর অবদান অনন্য। ২০০১ সালে তিনি তৃতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন এবং ফোর্বস ম্যাগাজিনের বিশ্বের প্রভাবশালী নারী তালিকায় স্থান করে নেন। তাঁর নেতৃত্বেই বাংলাদেশ 'ইমার্জিং টাইগার' হিসেবে পরিচিতি পায়।
খালেদা জিয়ার রাজনৈতিক জীবনের সবচেয়ে কঠিন সময় শুরু হয় ২০০৭ সালের এক-এগারোর পটপরিবর্তনের পর। মাইনাস টু ফর্মুলা উপেক্ষা করে তিনি দেশেই থেকে যান। পরবর্তীতে ২০০৯ সাল থেকে আওয়ামী লীগ সরকারের অধীনে তিনি একের পর এক রাজনৈতিক ও আইনি চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হন। পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয় তাঁর দীর্ঘদিনের স্মৃতিবিজড়িত সেনানিবাসের বাসভবন।
২০১৫ সালে রাজনৈতিক উত্তাল সময়ে ছোট ছেলে আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু ছিল তাঁর জীবনের বড় এক ব্যক্তিগত আঘাত। এরপর চ্যারিটেবল ও অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজা পেয়ে ২০১৮ সালে তাঁকে পুরনো ঢাকার নির্জন কারাগারে বন্দি হতে হয়।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দীর্ঘ বন্দিদশা ও আইনি বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি পান খালেদা জিয়া। মুক্তির পর দেওয়া ভিডিও বার্তায় তিনি প্রতিহিংসা ভুলে শান্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের ডাক দেন।
২০২৫ সালের শুরুতে উন্নত চিকিৎসার জন্য তিনি লন্ডন যান। সেখানে জ্যেষ্ঠ সন্তান তারেক রহমানের সান্নিধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বারবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এলেও এবার আর ফেরা হলো না কোটি মানুষের এই প্রিয় নেত্রীর।
এক কালজয়ী উত্তরাধিকার
খালেদা জিয়া কেবল একজন রাজপথের নেত্রীই ছিলেন না, তিনি ছিলেন সার্বভৌমত্ব ও জাতীয়তাবাদী চেতনার মূর্ত প্রতীক। জীবনের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত তিনি বলে গেছেন—
"দেশ এবং জনতা আমাদের কাছে বড়। দেশের বাইরে আমার কোনো ঠিকানা নেই। এই দেশের মাটি ও মানুষই আমার সবকিছু।"
শরীরী প্রস্থান ঘটলেও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে খালেদা জিয়া একটি অপরিহার্য ও প্রাসঙ্গিক নাম হিসেবে চিরভাস্বর থাকবেন।
জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ উপলক্ষে টাঙ্গাইলে বর্ণাঢ্য র্যালি আলোচনা সভা ও পুরস্কার বিতরণ জাতীয় মৎস্য পক্ষ ২০২৬ উপলক্ষে টাঙ্গাইলে বর্ণাঢ্য র্যাল...
গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকী উপলক্ষে ‘গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবিতে’ বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদের দক্ষিণ গেটে জামায়াতে ইসলামী নেতৃ...

