বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋনগ্রস্থ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র।

0
156
ছবিঃ- আমিরিকান পতাকা। অনলাইন থেকে সংগ্রহীত ।

সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋনগ্রস্থ দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে বিশ্বের এক নম্বর সামরিক সুপার পাওয়ার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মুলত ৩১শে ডিসেম্বর ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক ঋন এবং দেনার পরিমাণ প্রায় ২৭.৭০ ট্রিলিয়ন ডলার। যা কিনা বাংলাদেশী টাকায় অংকে প্রায় ২,৩২৬ লক্ষ কোটি টাকার সমান। আর বিগত ১০ বছরের মধ্যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ঋন গ্রহণের হার ও প্রবণতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌছে গেছে। যেখানে ২০২০ সালের ঠিক একই সময়ে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মোট ঋন ও দেনার পরিমাণ ছিল ২৩.৩০ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০১৫ সালে ছিল ১৮.০০ ট্রিলিয়ন ডলার। যা কিনা বিগত ৬ বছরে তাদের ঋন ও দেনার পরিমাণ আশাঙ্খাজনক হারে ৫৬% বৃদ্ধি পেয়েছে বলে প্রতিয়মান হয়। তবে ৩১শে জুলাই ২০২০ সালের হিসেব অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিদেশী দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার কাছ থেকে নেওয়া মোট বৈদেশিক ঋনের স্থিতির পরিমাণ ছিল ৭.০৬ ট্রিলিয়ন ডলার। আর এই সুবিশাল বৈদেশিক ঋনের মধ্যে একক কোন দেশ হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে সর্বোচ্চ ১.২৯ ট্রিলিয়ন ডলার ঋন প্রদান করেছে জাপান। আর আশ্চর্যজনক হলেও সত্য যে, চীনের সাথে মার্কিন যুক্তরাষ্টের চরম বানিজ্য বিরোধ এবং কৌশলগত শত্রুতা বিরাজ করলেও এ মুহুর্তে আমেরিকাকে বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ঋন প্রদানকারী দেশ কিন্তু চীন। ২০২০ সালের জুলাই মাসের হিসেব অনুযায়ী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে প্রদত্ত চীনের ঋনের স্থিতির পরিমাণ ১.০৭ ট্রিলিয়ন ডলারে পৌছে গেছে।তাছাড়া মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে বৈদেশিক ঋন প্রদানকারী দেশের তালিকায় জাপান এবং চীনের পাশাপাশি ব্রাজিল, হংকং, লুক্সেমবার্গ, আয়ারল্যাণ্ড, যুক্তরাজ্যসহ আরো বেশকিছু দেশের নাম রয়েছে। এক্ষেত্রে ব্রাজিল ২৬৭.১ বিলিয়ন ডলার, সুইটজারল্যাণ্ড ২৪৭.৪ বিলিয়ন ডলার, যুক্তরাজ্য ৪৪৫.৬ বিলিয়ন ডলার, হংকং ২৬৬.৪ বিলিয়ন ডলার এবং আয়ারল্যাণ্ড ৩৩০.৪ বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক ঋন হিসেবে মার্কিন ফেডারেল সরকারের বণ্ড, ট্রেজারি বিল এবং নোটস ক্রয় করে রেখেছে। আবার দেশের অভ্যন্তরে বিভিন্ন আর্থিক খাত থেকে মার্কিন প্রশাসনের ঋন গ্রহনের প্রবনতা ও হার আশাঙ্খাজনকভাবে বৃদ্ধি পেয়ে বিগত চার দশকের মধ্যে তা সর্বোচ্চ ২১.০০ ট্রিলিয়ন ডলারে এসে দাঁড়িয়েছে। আর এই বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক দেনার বোঝা মাথায় নিয়ে সারা বিশ্বে একক সর্বোচ্চ ঋনগ্রস্থ দেশ হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। বিশেষ করে অতি মাত্রায় যুদ্ধ প্রিয়তা, সুবিশাল সামরিক বাহিনী নিয়ে সারা বিশ্বব্যাপী শান্তির নামে আগ্রাসী কার্যকলাপ পরিচালনা এবং বিশেষ করে সারা বিশ্বব্যাপী প্রায় ছয় শতাধিক সামরিক ঘাঁটি এবং স্থাপনা পরিচালনা করতে গিয়ে প্রতি বছর ট্রিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি অর্থ নির্বিচারে ব্যয় করে যাচ্ছে দেশটি। ২০২১ সালে মার্কিন প্রশাসন সামরিক ও প্রতিরক্ষা খাতে ৭৪০ বিলিয়ন বরাদ্দ দিয়ে বরাবরের মতো বিশ্বের সর্বোচ্চ সামরিক খাতে ব্যয়কারী দেশের স্থান করে নিয়েছে। মার্কিন প্রশাসন বিপুল পরিমাণ অভ্যন্তরীন এবং বৈদেশিক ঋন নিয়ে দেশ পরিচালনা করলেও সারা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে থাকা প্রায় ছয় শতাধিকের কাছাকাছি সামরিক ঘাঁটি এবং সুবিশাল সামরিক বাহিনীর নিয়ে সারা বিশ্বে চলমান দীর্ঘ মেয়াদী বেশ কিছু যুদ্ধ পরিচালনায় বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয়ের দায় শেষমেষ বহন করতে হচ্ছে মার্কিন সাধারণ জনগণকে। যদিও কৌশলগত কারণে রাশিয়া ও চিনকে প্রতিহত করতে এসব সামরিক ঘাঁটির ৭০% পর্যন্ত আদৌ কোন দরকার আছে কিনা তার কোন যৌক্তিক জবাব মার্কিন প্রশাসন দিতে পারবে বলে মনে হয় না। আর এহেন চরম মাত্রায় অর্থনৈতিক সংকট মোকাবেলায় বা ঘাটতি নিরিসনে মার্কিন প্রশাসন অত্যন্ত কৌশলে সারা বিশ্বে যুদ্ধের আবহ তৈরি করে তাঁদের অতি লাভ জনক অস্ত্রের ব্যবসা চালিয়ে যেতে ব্যস্ত। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের বাদশা ও আমীর শাসিত দেশগুলোর কাছে নির্বিচারে চাঁদাবাজির পাশাপাশি বিলিয়ন বিলিয়ন ডলারের যুদ্ধাস্ত্র এবং সামরিক সাজ সরঞ্জাম তুলে দিচ্ছে একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে। যদিও এই শত বিলিয়ন ডলারের তেল ও অস্ত্র বানিজ্য মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে এই পাহাড় পরিমাণ ৭.০৬ ট্রিলিয়ন বৈদেশিক ঋনের বোঝা থেকে আগামী দুই দশকেও মুক্ত করতে পারবে কিনা সন্দেহ রয়েছে।তবে এটা ঠিক যে, বিশ্বের সর্বোচ্চ ঋনগ্রস্থ দেশ হওয়ার পাশাপাশি বর্তমানে বিশ্বের সর্বোচ্চ সম্পদশালী দেশ হচ্ছে কিন্তু মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। দেশটির নমিনাল জিডিপি ১৯ ট্রিলিয়ন ডলার এবং ২০২০ সালে চলা ভয়াবহ করোনা মহামারির মধ্যেও ১.৪৩ ট্রিলিয়ন ডলারের পন্য, অস্ত্র, সেবা এবং যন্ত্রপাতি কিংবা সাজ সরঞ্জাম বিদেশে রপ্তানি করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। মোট কথা বর্তমানে বিশ্বের ১০০টি সর্বোচ্চ রেভিনিউ অর্জনকারী এবং সম্পদশালী কোম্পনি বা কর্পোরেশনের মধ্যে প্রায় ৫০টি একক ভাবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে রয়েছে। যেমন বিশ্বের একক কোন সর্বোচ্চ আয় অর্জনকারী রিটেইলার কোম্পানি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্র ভিত্তিক ওয়ালমার্টের রেভিনিউ ৫২৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার এবং নীট মুনাফা হিসেবে ১৪.৮৮ বিলিয়ন ডলার আয় করে এবং মোট সম্পদের বিবেচনায় বিশ্বের বুকে একক সর্বোচ্চ কোন কোম্পানি হিসেবে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রযুক্তি পন্য আইফোন নির্মাতা প্রতিষ্ঠান এ্যাপল নিজের অবস্থান ধরে রেখেছে। ২০২০ সালের শেষের দিকে এ্যাপল জায়ান্ট কর্পোরেশনের মোট সম্পদের পরিমাণ ১.৯৭ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১৯৭১ বিলিয়ন ডলারে পৌছে যায়।আবার প্রায় এক শতাব্দী ব্যাপী মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মুদ্রা বা কারেন্সি ডলার একক কোন গ্রহনযোগ্য আন্তর্জাতিক মুদ্রা হিসেবে তার যোগ্য স্থান ধরে রেখেছে। বর্তমানে বৈদেশিক বানিজ্যের ৮০% পর্যন্ত লেনদেন করা হয়ে থাকে ডলারের বিনিময়ে। জোটভুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের ইউরো ১৯৯৯ সালে অত্মপ্রকাশ করলেও তা কখনই ডলারের বিকল্প কিছু হয়ে উঠতে পারেনি। আবার রাশিয়ার রুবেল, চীনের কারেন্সি ইউয়ান বা জাপানের ইয়েন কোনটিই আন্তর্জাতিক আদর্শ মুদ্রা হিসেবে আমেরিকার ডলারের বিকল্প কিছু হয়ে ওঠার মতো যথেষ্ঠ যোগ্যতা অর্জন করেছে কিনা সন্দেহ। তাই আপাতত দৃষ্টিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ এবং বৈদেশিক দেনা এবং ঋনের পরিমাণ যতই হোক না কেন দেশটির সার্বিক অর্থনীতি এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা আগামী এক শতাব্দীর মধ্যে ভেঙ্গে পড়ার আদৌ কোন সম্ভাবনা আছে বলে মনে হয় না।

সুত্রঃ- ফেসবুক ©সিরাজুর রহমান

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here